মাখরাজ পরিচিতি: কোরআন তিলাওয়াতে ১৭টি মাখরাজের সহজ বিবরণ
পবিত্র কোরআনুল কারিম মহান আল্লাহর বাণী। এই ঐশী বাণীকে সঠিকভাবে এবং সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। আরবি হরফগুলো সঠিক জায়গা থেকে উচ্চারণ না করলে অনেক সময় শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই তাজবীদ শাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'মাখরাজ' সম্পর্কে জানা।
মাখরাজ কী?
'মাখরাজ' (مخرج) একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো 'বের হওয়ার স্থান'। তাজবীদের পরিভাষায়—আরবি হরফগুলো মুখের যে স্থান থেকে উচ্চারিত হয়, সেই স্থানকেই মাখরাজ বলা হয়। আরবি হরফ মোট ২৯টি এবং এই হরফগুলো উচ্চারণের স্থান বা মাখরাজ হলো ১৭টি। মুখের ৫টি প্রধান অঙ্গ (মুখের খালি জায়গা, কণ্ঠনালী, জিহ্বা, ঠোঁট এবং নাসিকা) থেকে এই ১৭টি মাখরাজ উচ্চারিত হয়।
"কোরআন তিলাওয়াতের সৌন্দর্য এবং শুদ্ধতা নির্ভর করে হরফের সঠিক মাখরাজ ও সিফাত আদায়ের ওপর।"
১৭টি মাখরাজের বিস্তারিত বিবরণ
নিচে ১৭টি মাখরাজের স্থান এবং সেখান থেকে উচ্চারিত হরফগুলোর সহজ বিবরণ দেওয়া হলো:
মুখের খালি জায়গা (জাওফ)
- ১ নম্বর মাখরাজ: মুখের ভেতরের খালি জায়গা থেকে মদ্দের হরফগুলো উচ্চারিত হয়। (যেমন: যবরের পর খালি আলিফ, পেশের পর জযমওয়ালা ওয়াও, এবং জেরের পর জযমওয়ালা ইয়া)।
কণ্ঠনালী বা গলা (হলক)
- ২ নম্বর মাখরাজ: হলক বা কণ্ঠনালীর শুরু হতে (বুকের দিক থেকে) উচ্চারিত হয়— হামযাহ (ء), হা (هـ)।
- ৩ নম্বর মাখরাজ: কণ্ঠনালীর মাঝখান হতে উচ্চারিত হয়— আইন (ع), হা (ح)।
- ৪ নম্বর মাখরাজ: কণ্ঠনালীর শেষ ভাগ হতে (মুখের দিক থেকে) উচ্চারিত হয়— গাইন (غ), খা (خ)।
জিহ্বা (লিসান)
- ৫ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার গোড়া এবং তার সোজা উপরের তালুর সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— ক্বফ (ق)।
- ৬ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার গোড়া থেকে একটু আগে বেড়ে তার সোজা উপরের তালুর সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— কাফ (ك)।
- ৭ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার মধ্যখান এবং তার সোজা উপরের তালুর সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— জীম (ج), শীন (ش), ইয়া (ي)।
- ৮ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার গোড়ার কিনারা উপরের মাড়ির দাঁতের গোড়ার সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— দ্বোয়াদ (ض)।
- ৯ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগার কিনারা উপরের সামনের দাঁতের মাড়ির সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— লাম (ل)।
- ১০ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগা তার সোজা উপরের তালুর সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— নুন (ن)।
- ১১ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগার পিঠ তার সোজা উপরের তালুর সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— র (ر)।
- ১২ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগা উপরের সামনের দু’টি দাঁতের গোড়ার সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— ত্বা (ط), দাল (د), তা (ت)।
- ১৩ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগা নিচের সামনের দু’টি দাঁতের আগার সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— সোয়াদ (ص), যা (ز), সীন (س)।
- ১৪ নম্বর মাখরাজ: জিহ্বার আগা উপরের সামনের দু’টি দাঁতের আগার সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— যোয়া (ظ), যাল (ذ), ছা (ث)।
ঠোঁট (শাফাতাইন)
- ১৫ নম্বর মাখরাজ: নিচের ঠোঁটের ভেতরের অংশ উপরের সামনের দু’টি দাঁতের আগার সাথে লাগিয়ে উচ্চারিত হয়— ফা (ف)।
- ১৬ নম্বর মাখরাজ: দুই ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হয়— বা (ب), মীম (م), ওয়াও (و)। (বা- ভেজা অংশ থেকে, মীম- শুকনা অংশ থেকে এবং ওয়াও- ঠোঁট গোল করে)।
নাসিকা বা নাকের বাঁশি (খাইশুম)
- ১৭ নম্বর মাখরাজ: নাকের বাঁশি হতে গুন্নাহ উচ্চারিত হয়। (যেমন: নুন সাকিন বা মীম সাকিন এবং তাশদীদযুক্ত নুন ও মীম-এর গুন্নাহ)।
উপসংহার
মাখরাজ শুধু বই পড়ে বা আর্টিকেল দেখে পুরোপুরি শেখা সম্ভব নয়; এর জন্য একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকের কাছে সরাসরি উচ্চারণ শোনা এবং অনুশীলন করা একান্ত প্রয়োজন। আসুন, আমরা আমাদের তিলাওয়াতকে শুদ্ধ করার জন্য আজই মাখরাজ অনুশীলনে মনোযোগী হই। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বিশুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
0 মন্তব্যসমূহ